চীনে শেয়ারবাজারে কারসাজি ঠেকাতে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ে কড়াকড়ি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি নিয়ে চীন সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশ লক্ষণীয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি নিয়ে চীন সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশ লক্ষণীয়। এর প্রভাবে দেশটির শেয়ারবাজারে এসব খাতের কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে কিছু কোম্পানি যথাযথ জ্ঞান নেই এমন অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার ও ফান্ড বিষয়ে প্রচারণা বা মার্কেটিং চালানোয় বাজারে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। এমন কারসাজি ঠেকাতে কড়াকড়ি শুরু করেছে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণই এখন বেইজিংয়ের লক্ষ্য। খবর নিক্কেই এশিয়া।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অপ্রত্যাশিত ওঠা-নামা থেকে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ আগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত না করা, এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে যে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে সরকারের নিজস্ব নীতিগত লক্ষ্যই বড় ভূমিকা রাখছে।

চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন (সিএসআরসি) গত মাসে একটি ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে শাস্তি দিয়েছে। কারণ নিজেদের প্রচারে এমন অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের অর্থ দিয়েছিল, যারা ওই বিষয়ে যথাযথ অভিজ্ঞ নন। সিএসআরসি বলছে, কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি গ্রহণ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন পণ্য কিনতে প্রলুব্ধ করেছে। স্বল্পমেয়াদি মুনাফার আশায় পেশাগত নিয়মনীতির অবহেলা করেছে কোম্পানিটি।

এর আগেই ইনফ্লুয়েন্সার জিন ইয়ংরংকে জরিমানা এবং তিন বছরের জন্য সিকিউরিটিজ বাজার থেকে নিষিদ্ধ করে সিএসআরসি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রভাব ব্যবহারের মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে পরে শেয়ার বিক্রি করে ৪ কোটি ১০ লাখ ইউয়ানের বেশি অবৈধ মুনাফা করেছেন।

ফাইন্যান্সভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ স্নোবল ফাইন্যান্স দ্রুত জিনসহ ২০টির বেশি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। যদিও তারা কী নিয়মভঙ্গ করেছে বিস্তারিত জানায়নি।

বাজারের অতিরিক্ত অস্থিরতা নিয়ে কর্মকর্তাদের উদ্বেগের সাম্প্রতিক ইঙ্গিত হিসেবে এসব পদক্ষেপকে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। ডেটা পরিষেবাদাতা কোম্পানি উইন্ড জানিয়েছে, গত মাসে মূল ভূখণ্ড চীনে শেয়ারে লেনদেনের জন্য ৪৯ লাখ ১০ হাজার নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর মাসভিত্তিক হিসেবে এটি সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতের মতো থিমভিত্তিক অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত প্রযুক্তি শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন।

সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বৃহৎ শেয়ারগুলোর সিএসআই ৩০০ ইনডেক্স চলতি বছরে দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কোম্পানির সিএসআই ৫০০ ইনডেক্স বেড়েছে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। সাংহাইয়ের প্রযুক্তিকেন্দ্রিক স্টার মার্কেটে তালিকাভুক্ত শেয়ারগুলোর মানদণ্ড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনোভেশন বোর্ড কম্পোজিট ইনডেক্স বেড়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।

চীনা শিল্প সরঞ্জাম সরবরাহকারী উক্সি অটোওয়েল টেকনোলজির শেয়ারদর বছরের শুরু থেকে ১২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। চিপ নির্মাতা পুয়া সেমিকন্ডাক্টর এবং সোলার প্যানেলের উপকরণ প্রস্তুতকারক ফোকাসলাইট টেকনোলজিসের শেয়ারদরও দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অন্যদিকে ৬৫ শতাংশ উল্লম্ফন দেখেছে অটোমেশন সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক সাপকন টেকনোলজি।

আন্তর্জাতিক একটি সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক বলেন, ‘আংশিকভাবে দেখলে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগের অভাব রয়েছে চীনে। সেখান থেকে শেয়ারবাজারে আসছে নতুন মূলধনের ঢল। কারণ সরকারি বন্ডের ইল্ড কম এবং সম্পত্তির দাম কমছে। কোম্পানিগুলোর বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় বিনিয়োগ হচ্ছে না, বরং বিকল্পের সংকটই এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।’

চীনে সম্প্রতি পণ্যবাজারেও দামের অস্বাভাবিক ওঠানামার হার বেড়েছে। শেনজেনে রুপার ফিউচার্স-কেন্দ্রিক একটি তহবিলে বিনিয়োগ জানুয়ারিতে দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা নির্ধারিত প্রকৃত মূল্যের বিবেচনায় অনেক বেশি। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এক টিউটোরিয়ালে বলা হয়, কোম্পানিটি থেকে শেয়ার কিনে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি করলে দ্রুত মুনাফা পাওয়া যাবে। এতে বাজারে কোম্পানিটিতে বিনিয়োগের উন্মাদনা বেড়ে যায়।

তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউবিএস এসডিআইসি ফান্ড ম্যানেজমেন্ট গত ২৮ জানুয়ারি ইউনিটধারীদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন সাবস্ক্রিপশন স্থগিত করে। শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ অস্বাভাবিক লেনদেন আচরণে জড়িত বিনিয়োগকারীদের ট্রেডিং স্থগিত করে। একই সময় রুপার ফিউচার্সের দাম তীব্রভাবে পড়ে যায়। সেকেন্ডারি মার্কেটে ফান্ডটির ইউনিট টানা পাঁচদিন দৈনিক ১০ শতাংশ সর্বোচ্চ পতনসীমায় নেমে আসে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে শেয়ারবাজারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে সমর্থন দিয়ে আসছে চীনা কর্তৃপক্ষ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও কৌশলগত শিল্প খাতের কোম্পানির তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিল করেছে। দ্রুততর যাচাই প্রক্রিয়া অতিক্রম করা চিপ স্টার্টআপ মোর থ্রেড লেনদেনের প্রথম দিনই শেয়ার পাঁচগুণ দর বাড়ার সাক্ষী হয়।

বাজারের এ অস্থিরতা কমানোর পদক্ষেপও গতিশীল হয়েছে চীনে। গত মাসে এক সম্মেলনে সিএসআরসি কর্মকর্তারা অতিরিক্ত জল্পনা ও বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং তীব্র বাজার ওঠানামা দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধের অঙ্গীকার করেন। কিন্তু দেশটির শেয়ারবাজারের দৈনিক লেনদেনের ৮০ শতাংশের বেশি খুচরা বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে হয়। একে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপি পারিবাসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ইকুইটি ও ডেরিভেটিভ কৌশলপ্রধান জেসন লুই বলেন, ‘চীন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো কম অস্থিরতা নিশ্চিত করা। কারণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে স্থিতিশীলতা দরকার।’

আরও